Home / ধর্ম চিন্তা / জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক

জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ

গৌতম বুদ্ধ নেপালের শাক্যরাজ শুদ্ধোধন ও রাণী মহামায়ার সংসারে জন্মগ্রহণ (খৃস্ট-পূর্ব ৫৬৩ সালে) করলেও রাজকীয় ভোগ-বিলাস ও সুখ ত্যাগ করে জগতের সকল প্রাণীকে সুখী করতে কঠোর সাধনায় ব্রত হন। ঘুরে বেড়ান বনে-বাদাড়ে। তপোবনের সন্ন্যাসীদের কাছে ধ্যানের কৌশল রপ্ত করে ডুবে যান ধ্যানে। বুদ্ধের মূলমন্ত্র “সব্বে সত্তা সুখিতা ভবন্ত”। অর্থাৎ জগতের সকল প্রাণী সুখী হোক। বুদ্ধ বলেছেন, জগতে কর্মই সব। মানুষ তার কর্ম অনুসারে ফল ভোগ করবে। ভাল কাজ করলে ভাল ফল এবং খারাপ কাজের জন্য খারাপ ফল পাবে। কর্মানুসারে মানুষ অল্প আয়ু, দীর্ঘ আয়ু, জটিল ব্যাধিগ্রস্ত, নিরোগ, বিশ্রী-সুশ্রী, সুখী-দুঃখী, উঁচু-নিচু, জ্ঞান-মূর্খতা ইত্যাদি প্রাপ্ত হয়। মানুষ কর্মের অধীন।
আমি বুদ্ধ সম্পর্কে প্রথম জানি রবীন্দ্রনাথে সাহিত্যে। বৌদ্ধআখ্যান নিয়ে রবীন্দ্রনাথ কোনো উপন্যাস রচনা করেননি। তবে ‘ঘরে বাইরে” (১৯১৬) উপন্যাসে নিখিলেশের আত্মকথায় এবং ‘শেষের কবিতা’ (১৯২৯) উপন্যাসে ১৩শ পরিচ্ছেদের প্রাসঙ্গিক উক্তিতে বুদ্ধপ্রসঙ্গ রয়েছে। ‘শোধবোধ’ (১৯২৬) নাটকে বুদ্ধদর্শনের প্রভাব নেই, কিন্তু বুদ্ধপ্রসঙ্গের উল্লেখ রয়েছে। যেমন সতীশ ও নলিনীর সংলাপে- “তুমি তো তুমি, এখানে স্বয়ং বুদ্ধদেব এসে যদি দাঁড়াতেন, আমি দুই হাত জোড় করে পায়ের ধুলো নিয়েই তাঁকে বলতু”।
রবীন্দ্রনাথের পারিবারিক আবহেও ছিল বৌদ্ধ দর্শনের প্রভাব। তাঁর ভাই দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আর্যধর্ম এবং বৌদ্ধধর্মের পরস্পর ঘাতপ্রতিঘাত ও সঙ্ঘাত’ (১৮৯৯) এবং সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘বৌদ্ধধর্ম’ (১৯০১) গ্রন্থদুটিই তার প্রমাণ বহন করে।
সারনাথে মূলগন্ধকুটিবিহার প্রতিষ্ঠা-উপলক্ষে ‘বুদ্ধদেবের প্রতি’ নামের এক কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বুদ্ধদেবের নামের মহিমা প্রচার করেছেন। তিনি লিখেছেন-
বুদ্ধদেবের প্রতি
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

ওই নামে একদিন ধন্য হল দেশে দেশান্তরে
তব জন্মভূমি।
সেই নাম আরবার এ দেশের নগর প্রান্তরে
দান করো তুমি।
বোধিদ্রুমতলে তব সেদিনের মহাজাগরণ
আবার সার্থক হোক, মুক্ত হোক মোহ-আবরণ,
বিস্মৃতির রাত্রিশেষে এ ভারতে তোমারে স্মরণ
নবপ্রাতে উঠুক কুসুমি।
চিত্ত হেথা মৃতপ্রায়, অমিতাভ, তুমি অমিতায়ু,
আয়ু করো দান।
তোমার বোধনমন্ত্রে হেথাকার তন্দ্রালস বায়ু
হোক প্রাণবান।
খুলে যাক রুদ্ধদ্বার, চৌদিকে ঘোষুক শঙ্খধ্বনি
ভারত-অঙ্গনতলে, আজি তব নব আগমনী,
অমেয় প্রেমের বার্তা শতকণ্ঠে উঠুক নিঃস্বনি-
এনে দিক অজেয় আহ্বান।

বুদ্ধকে মূল্যায়ন করে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- “একদিন বুদ্ধ বললেন, আমি সমস্ত মানুষের দুঃখ দূর করব। দুঃখ তিনি সত্যিই দূর করতে পেরেছিলেন কিনা সেটি বড়ো কথা নয়। বড়ো কথা হচ্ছে- তিনি এটি ইচ্ছা করেছিলেন, সমস্ত জীবের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছিলেন।”

কবিগুরুর মতো ব্যক্তিগতভাবে আমিও গৌতম বুদ্ধের এই ইচ্ছা এবং আত্মোৎসর্গকে শ্রদ্ধা করি। আমিও মাঝে মাঝে ভাবি- মানুষ আর মশার মতো পরষ্পর বিরোধীরাও কিভাবে একসাথে সুখী হওয়া যায়। কিভাবে সুখী হওয়া যায় বৌদ্ধ আর রোহিঙ্গা! কিভাবে একসাথে সুখী হওয়া যায় সাপে-নেউলে সম্পর্কগুলো।

সূত্রনিপাত গ্রন্থের মৈত্রীসূত্রে বলা হয়েছে: ‘সভয় বা নির্ভয়, হ্রস্ব বা দীর্ঘ, বৃহৎ বা মধ্যম, ক্ষুদ্র বা স্থূল, দৃশ্য অথবা অদৃশ্য, দূরে অথবা নিকটে যে সকল জীব জন্মগ্রহণ করেছে বা জন্মগ্রহণ করবে, সে সকল প্রাণী সুখী হোক।’

এই সুখী হওয়ায় অবশ্যই রোহিঙ্গারাও আছেন। কাজেই রোহিঙ্গারাও সুখী হোক- প্রত্যাশাটা করতেই পারি। বরং মশার জন্য সুখ প্রত্যাশা করতে গিয়েই তালগোল পাকিয়ে ফেলি। কেম্নে কি?

Check Also

বনসাই

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। পুরো পৃথিবীই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। জাপানের মানুষগুলো কেবল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *