Home / লেখালেখি / বনসাই

বনসাই

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। পুরো পৃথিবীই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। জাপানের মানুষগুলো কেবল ঘুম থেকে জেগে কর্ম ব্যস্ত হতে চলেছে। টোকিও শহরে সদ্য ভূমিষ্ট সন্তানকে বুকের প্রথম শালদুধ পান করাচ্ছেন মাতৃত্বজয়ী এক মা। তার ঠোঁটের কোনে লেগে আছে প্রসবানন্দের হাসি। টোকিও থেকে ৫০০ মাইল দূরে হিরোশিমা নামক শহরে প্রসব বেদনায় কাতরাচ্ছেন এক মহিলা। মায়ের গর্ভ থেকে পৃথিবীতে ভূমিষ্ট হতে যাচ্ছে এক শিশু। মায়ের শরীর থেকে এক তৃতীয়াংশ বেরিয়েও এসেছে শিশুটি। প্রসব বেদনা সইতে না পেরে মায়ের আর্তচিৎকারে ভারি হয়ে উঠেছে আশপাশ। সময় ৮ টা বেজে ১৫ মিনিট। বিকট এক শব্দে হারিয়ে গেলো মায়ের আর্তচিৎকার। হ্যাঁ, পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার শব্দের কথাই বলছি। যুক্তরাষ্ট্র বোমাটির ডাকনাম দিয়েছিল ‘লিটল বয়’। নামে “লিটল বয়” হলেও এই দানব পারমাণবিক বোমার নির্মম ধ্বংসযজ্ঞ যে মোটেও লিটল নয় তা পৃথিবীর সবাই জানেন।
বোমার তীব্রতার কারণে দুই কিলোমিটারের মধ্যে যতগুলো কাঠের স্থাপনা ছিল সব ক’টি মাটির সঙ্গে মিশে যায়। ৫০০ মিটার বৃত্তের মধ্যে আলিশান দালানগুলো চোখের পলকে ভেঙেচুরে ধুলিসাৎ হয়ে যায়। ৫ বর্গমাইল এলাকা মোটামুটি ছাই এবং ধ্বংসস্তুপে পরিণত হয়। বোমা বিস্ফোরিত হওয়ার সময় হিরোশিমা নগরীর লোকসংখ্যা ছিল প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার। পারমাণবিক বোমার দাপটে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার অধিবাসীর মৃত্যু হয়। আহত হয় আরও কয়েক লক্ষ মানুষ। শুধু তাই নয়, এই বিধ্বংসী পারমাণবিক বোমার অভিশাপের নির্মম শিকার হয় পরবর্তী প্রজন্মও। বেঁচে ফেরা অনেক পরিবারে জন্ম নিতে থাকে বিকলাঙ্গ শিশু।
সেদিক থেকে হিরোশিমা থেকে মাত্র ২ মাইল দূরে সম্ভ্রান্ত ইয়ামাকি পরিবারটিকে বেশ সৌভাগ্যবানই বলতে হয়। বোমার তীব্রতায় এই পরিবারের বাসাবাড়ি সম্পূর্ণ তছনছ হয়ে গেলেও পরিবারের অধিকাংশই সেদিন বেঁচে যান। তাদের সাথে থাকা বনসাই বৃক্ষটি থেকে যায় অক্ষত। এরপর থেকে এই বৃক্ষের নাম হয়ে যায় “হিরোশিমা বনসাই”। “হিরোশিমা বনসাই” বৃক্ষটি এখন ইতিহাসের স্বাক্ষী।
ইয়ামাকি পরিবারের এক বংশধর মাসারু ইয়ামাকি ১৯৭৫ সালে হিরোশিমা বনসাই বৃক্ষটি দান করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় উদ্যান ইউনাইটেড স্টেটস ন্যাশনাল আরবোরেটুম এ হিরোশিমা বনসাইকে রাখা হয়েছে। কিন্তু অতি আশ্চর্যের বিষয় এই যে, গাছটি যুক্তরাষ্ট্রকে দান করার সময় ইয়ামাকি পরিবারের তরফ থেকে সেদিন জানানো হয়নি এই গাছটির নাম “হিরোশিমা বনসাই” কিংবা এই বনসাইয়ের সাথে হিরোশিমার স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে।
২০০১ সালে মাসারু ইয়ামাকির নাতিরা হিরোশিমা বনসাই গাছটিকে দেখতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যান। সেদিন তারা তুলে ধরলেন হিরোশিমা বনসাই এর স্মৃতিকথা। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এই তথ্যকে সম্পূর্ণরূপে অস্বীকার করে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করে, দু’দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব বাড়াতেই এই উপহার দিয়েছিলেন ইয়ামাকি পরিবার।
২০০৩ সালেও মাসারু ইয়ামাকি পুত্র ইয়াসুয়ো ইয়ামাকি হিরোশিমা বনসাই গাছটি পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। কিন্তু ইয়ামাকি পরিবার বনসাইটি যুক্তরাষ্ট্রকে কেন উপহার দিয়েছিলেন? ইয়ামাকি পরিবার এখনো বিষয়টি বলেননি।
হিরোশিমা বনসাইয়ের বয়স এখন ৪০০ বছর। গাছটি এখনো যুক্তরাষ্ট্রের দানবীয় পারমাণবিক বোমা হামলার স্বাক্ষী হয়ে আছে। প্রায় ৪০০ বছরেরও বেশি বাঁচে এই গাছ। বনসাইটি আরো দীর্ঘায়ু হোক। দানবীয় আচরণের স্বাক্ষী হয়ে থাকুক।
অনেকেরই প্রশ্ন থাকতে পারে, বনসাই কি? আসলে বনসাই হচ্ছে একটি জীবন্ত ভাস্কর্য৷ টব বা ট্রের মধ্যে ফলানো বৃক্ষই বনসাই। শক্ত কাণ্ড রয়েছে এমন বৃক্ষকে ক্ষুদ্রাকৃতিতে রাখার শিল্প এটি। তাই বনসাইকে একটি জীবন্ত শিল্পকর্মও বলতে পারেন।
বনসাই করতে ব্যবহৃত ট্রে, টব বা যে পাত্র ব্যবহার করা হয় তাকে “বন” বলা হয়। আর বন এর উপর ক্ষুদ্রাকৃতির বৃক্ষকে বনসাই বলা হয়।
আমাদের দেশের রাজধানীর বিমান বন্দর সড়কটি সাজানোর জন্য অনেক বনসাই উপহার দিয়েছে চীন। তবে এগুলো ক্ষুদ্রাকৃতির নয়। অপেক্ষাকৃত বৃহদাকৃতির বনসাই। চীন আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশ। আমাদের সাহায্য সহযোগিতা করেন। সাহায্য করতে এসে আমাদের দেশে চীনের অনেক নাগরিকের প্রাণ কেড়ে নিয়েছি আমরা।
আমার আলোচনার বিষয় এসব নয়। আমার আলোচনার বিষয় অন্যকিছু। বনসাই নিয়ে আমার কিছু চমৎকার উপলব্ধি রয়েছে।
একটি বট বৃক্ষের চারা ট্রে অথবা টবে রোপণ করে নিয়ম অনুযায়ী পরিচর্যা করলে শত বছর পরও সেটি ১০ সেন্টিমিটার কিংবা ২০ সেন্টিমিটার আকারের বনসাই।
একই বট বৃক্ষের চারাটি যদি ভূমিতে রোপণ করি কোন পরিচর্যা ছাড়াই শত বছর পর সেটি বিশালাকার বট বৃক্ষ।
এর একটাই কারণ। শেকড়। বৃক্ষের শেকড় ট্রে কিংবা টবের বাইরে যেতে পারেনা বলেই বৃক্ষটি বড় হতে পারে না। সেটি শত শত বছর পরও ১০ কিংবা ২০ সেন্টিমিটার আকারের বনসাই। শোভা পায় সৌখিন কোন মানুষের ড্রয়িং রুমে কিংবা অফিসে।
আর বৃক্ষের শেকড় ট্রে কিংবা টবের বাইরে গিয়ে ভূমিতে ছড়িয়ে করতে পারলেই সেটি শাখা, প্রশাখা ও ডালপালা সমান্তরালে ছড়িয়ে দেয়। পরিণত হয় বিশালাকার বট বৃক্ষে। রোদে অনেক মানুষ একসাথে আশ্রয় নেয় বট বৃক্ষটির ছায়ায়। শত শত পাখি কিচির মিচির করে উড়ে বেড়ায় বট বৃক্ষ জুড়ে।
আসুন, আরেকটু গভিরে গিয়ে চিন্তা করি।
মানুষ। কিছু মানুষ তার নির্দিষ্ট চিন্তা চেতনার বাইরে কিছুই ভাবতে পারে না। সেও এক ধরণের বনসাই। যখনই সে নির্দিষ্ট চিন্তা চেতনার বাইরে গিয়ে সঠিক কিছু ভাবতে পারবে সে তখন সুপার মানুষ হয়ে যায়।
জাতি। বাঙালি বীরের জাতি। বাঘ। আরো কতো কিছু। বৃটিশরা আমাদের দুই শত বছরের মতো শাসন করেছে। শিক্ষা-দিক্ষা তেমন কিছু দেয়নি। কেবল কেরানীগিরি করতে যা লাগে তা শিখতে দিয়েছে। আমরা এখনো চাকরির জন্য আবেদনপত্র লেখা শিখি জীবনের অর্ধেক সময়। চাকরি করার মানষিকতা আমাদের জাতির মাঝে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছে। ঘরে ঘরে চাকরি দেব বললেই দেশের প্রতিটি ঘর খুশিতে আত্মহারা হয়ে যায়। এই জাতি চাকরি নামক ট্রে কিংবা টবের বাইরে ভাবতে শিখেনি। এটা বনসাই জাতি। এই চাকরি থেকে চিন্তা চেতনা যখনই বের করে নতুন উদ্ভাবনের জন্য ভাবতে জানবে, তখনই একটি সমৃদ্ধ জাতি হয়ে যাবে।
বৃত্তের বাইরে চিন্তা করা খুব বড় ব্যাপার নয়।
আমরা মায়ের দুধ পান করা বন্ধ করার পর থেকেই প্রতিদিনই খাবার খাচ্ছি। ভাত খাচ্ছি। অথচ আমাদের ওই ভাত খাওয়া নিয়েই যতো না চিন্তা। কোনভাবেই অন্য মাত্রায় চিন্তার প্রসার করতে পারিনা।
আমার লেখার বিষয় এটা নয়। শেষ পর্যন্ত যে বিষয়টা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম সেটাই লিখা হচ্ছে না।
আরে না। ভুল ধরেছেন।
আপনি ভাবছেন রাজধানীর বিমান বন্দর সড়কে বনসাই লাগানোর বিষয়টা নিয়ে লিখতে চেয়েছিলাম। সেটা নিয়ে তো লিখেছি।
আসলে আমি লিখতে চেয়েছিলাম একটি মনস্তাত্ত্বিক বিষয় নিয়ে। আর মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টা লিখবই বা কেমনে?
যারা মনস্তাত্ত্বিক ব্যাপার নিয়ে নাড়াচাড়া করেন, তারা হয়তো এতোক্ষণে সিগনালটা পেয়েও গেছেন। আসলে এটা লিখে বুঝানোর মতো ব্যাপারও নয়। জাস্ট সিগনালের ব্যাপার।

Check Also

স্বপ্ন- দেখার নাকি চাপিয়ে দেয়ার

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ স্বপ্ন। নিজেকে নিয়ে হোক আর অন‌্যকে নিয়ে হোক। সেটি স্বপ্ন। কলেজ জীবনে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *