Home / Uncategorized / রোহিঙ্গা কিশোরী

রোহিঙ্গা কিশোরী

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ॥ রোহিঙ্গা কিশোরী। সুন্দর অথচ বিবর্ণ চেহেরা। অপলক তাকিয়ে আছে এদিকে। করুণ সেই চাহনী। দরজার কাঁচ ভেদ করে এই চাহনী বিধেঁছে আমার হৃদয়ে । তার এই চাহনীতে কাঁচ ভাঙেনি; ভেঙ্গে গেছে আমার হৃদয়। রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে হৃদয়ে। প্রতিটি মুহুর্তেই দুর্বল হতে চলছে আমার মন। দুর্বল হতে চলেছি আমি নিজে।
আমি অনিচ্ছা সত্ত্বেও গাড়ীর দরজার কাঁচ কিছুটা নামালাম। নতপায়ে এগিয়ে এলো কিশোরী। আর ডান হাতটি উঠে এলো কাঁচ বরাবর। এ এক নির্মম শারীরিক ভাষা। অনিচ্ছা সত্ত্বেও সাহায‌্যের জন‌্য হাত পাতা! এ যেন শরীরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। মনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ। এই শারিরীক ভাষার আবেদন কেবল একমুঠো অন্ন, একটু মাথা গুজার ঠাঁই কিংবা বেঁচে থাকার দাবি।
প্রচণ্ড রোদ। গাড়ীর ভেতরের ঠাণ্ডা বাতাস গরম হতে বেশিক্ষণ সময় লাগেনি। উৎকট গন্ধে ড্রাইভারও বিরক্ত। কিন্তু গরম কিংবা দূর্গন্ধ; কোনটাতেই মনোযোগ যায়নি আমার। আমার সব মনোযোগ কিশোরীকে ঘিরে।
আমি কোমল কণ্ঠে কিশোরীকে বললাম, “কি নাম তোমার?”
এতোক্ষণে তার দৃষ্টি নত করলো কিশোরী। নিচে নেমে গেলো ডান হাতটিও। দ্বিগুণ লজ্জা ও অজানা অভিমান যেন ভর করেছে তাকে। তাহলে নাম জানতে চেয়ে কি ভয়ানক অপরাধটাই করলাম? এমন প্রশ্ন জাগে মনে।
কিশোরীর সাথে আলাপের পর বুঝলাম- এটি আসলেই আমার অপরাধ ছিল! কেননা, এখন তার নামটি মনে করাও তার জন‌্য কষ্টের। কারণ, এক সপ্তাহ ধরে তাকে কেউ নাম ধরে ডাকেনি। আদুরে সুরে নাম ধরে ডাকবেই বা কে? নাম ধরে ডাকার মতো দুনিয়াতে তার যে আর কেউ নেই।
তাদের ছোট বাড়িটি ছিল পাহাড়ের পাদদেশে। মা-বাবা ও ভাই-বোনের সুখী পরিবার। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ভাই-বোনরা পাহাড়ের উপর খেলছিল। এই অবুঝ শিশুদের খেলার আনন্দময় মুহুর্তে দাঁড়িয়েই যে এমন হৃদয় বিদারক এবং পৃথিবীর সবচেয়ে জঘন‌্যতম দৃশ‌্যের স্বাক্ষী হতে হবে কেই বা জানতো! সেই ঘটনা বর্ণনা করার ভাষা কিশোরীর নেই। নেই আমারও। কিন্তু সেরকম এক অবর্ণনীয় ঘটনা ঘটাতে পেরেছে মিয়ানমারের মগরা।
অনেকটা বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে কিশোরী। ঘটনার কঠিন মুহুর্তটির কথা বলতে গেলেই নির্মম দৃশ‌্যটি চোখে ভেসে উঠে তার। তখন সে বাকরুদ্ধ হয়ে যায়। সচল হয় কেবল তার চোখের পানি। এই চোখই তো সব ঘটনার স্বাক্ষী। কাজেই চোখের পানি দিয়েই দৃশ‌্যগুলো দেখাতে চায় কিশোরী। আমিও তার চোখের বহমান পানিতে ঘটনার প্রতিচ্ছবিগুলো দেখার চেষ্টা করছি। ভয়াবহ সেই প্রতিচ্ছবি।
তার চোখের পানি যতই গড়িয়ে পড়ছে; এগিয়ে চলেছে ঘটনার ধারাবাহিকতা।
ক‌্যামরা যেমন কোন দৃশ‌্যকে ধারণ করে তার ফিতা কিংবা মোমোরিতে। কিশোরীর চোখও যেন সব দৃশ‌্য ধারণ করেছে তার অশ্রুতে। আমি কিশোরীর অশ্রুতে যেন সবকিছুই দেখতে পাচ্ছি। একটু পর নিজের অজান্তেই সেই দৃশ‌্য যেন ভেসে উঠলো নিজের অশ্রুতে। কিশোরীর অশ্রুর দিকে তাকানোর আর শক্তি নেই আমার। আমি নিজের অশ্রুতে দেখতে পাচ্ছি সব। কিশোরী তার ভাই-বোনদের নিয়ে পাহাড়ের উপর খেলছে। মিয়ানমারের মগরা সেই পাহাড়ের নিচে থাকা তাদের ছোট ঘরটিতে অভিযান শুরু করেছে। মগদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে আহত তার বাবা মৃত‌্যু যন্ত্রণায় কাঁতরাচ্ছেন। মৃত‌্যুর আগের মুহুর্তে তার বাবাকে দেখতে হচ্ছে প্রিয় স্ত্রীকে ধর্ষণের দৃশ‌্য। পাহাড়ের উপরে ভাই-বোনদের খেলা মুহুর্তেই থেমে গেল। সেই সাথে থেমে গেলো খেলার আনন্দমুখর পরিবেশটি। আর পরিবেশটি ক্রমশঃ এতো করুণ হতে চলেছে- কল্পনাও করা যায়না। সন্তানরা সবাই কিংকর্তব‌্যবিমূঢ়। কি করবে কেউ ভেবে পাচ্ছেনা। নিঃশব্দে কেঁদে কেঁদে পিতার মৃত‌্যুর যন্ত্রণা এবং মায়ের ধর্ষিত হওয়ার দৃশ‌্যই কেবল দেখতে হচ্ছে তাদের। একবার ইচ্ছে হচ্ছে পাহাড় থেকে উড়ে গিয়ে মা বাবাকে উদ্ধার করবে। মগদের শেষ করে দেবে। কিন্তু হাত-পা কিছুই নড়েনা। যেন পাথর হয়ে গেছে তারা।
মাকে ঘরের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে ঘরে আগুন ধরিয়ে দিল মগরা। দাউ দাউ করে সারা ঘরে জ্বলে উঠল আগুন। আগুনের লেলিহাত শিখা পাহাড়ের উপর থাকা ভাই-বোনদের শরীরও যেন ঝলসে যাচ্ছে। সাথে পাহাড় বেয়ে উঠে যাচ্ছে ধোঁয়ার কুণ্ডলী। সেই ধোঁয়ার সাথে ভেসে যাচ্ছে মায়ের আর্তচিৎকার। মায়ের আর্তচিৎকারে ভারী হয়ে উঠেছে আকাশ বাতাস। পাহাড়ে থাকা গাছের কাঁচা পাতাগুলো পুড়ে পুড়ে উড়ে যাচ্ছে ধোঁয়ার সাথে।
মৃত‌্যু পথযাত্রী বাবা। নিজের ঘরের আগুনে জীবিত পুড়ানো হচ্ছে ধর্ষিত মাকে। এতেও ক্ষান্ত নয় মগরা। ধারালো অস্ত্রের আঘাতে বাবার মাথাকে শরীর থেকে আলাদা করে জলন্ত ঘরের মাঝে ছুড়ে মারলো। এরপর শরীরের বিভিন্ন অংশ কেটে কেটে ছুড়ে মারছে ঘরের জলন্ত আগুনে।
পাহাড় জুড়ে এখন আগুনের লেলিহান শিখা আর ধোঁয়া। এখন চোখে পানি কেবল ধোঁয়ার কারণে। কষ্টের কারণে চোখে যে পানি এসেছিল, তা অনেক আগেই আগুনে শুকিয়ে গেছে। ধোঁয়ার কারণে ঠিকমতো নিঃশ্বাসও নিতে পারছেনা তারা। মায়ের কষ্টের কিছুটা যেন তারাও বুঝতে পারছে পাহাড়ের চূড়ায় থেকে। ছোট ভাইটি কান্নার শব্দ আর দমিয়ে রাখতে পারলোনা। সজোরে কান্না করছে ছোট ভাই। আর কান্নার এই শব্দ শুনার সাথে সাথেই তাদের ধরতে পাহাড়ের দিকে দৌঁড়ে যায় মগরা। ভাই-বোনরাও দৌঁড় শুরু করে। ধোঁয়ার মাঝে প্রাণ বাঁচানোর দৌড়। ছোট ভাইটাকে মগরা ধরে ফেলেছে। পাহাড়ের উপর থেকেই ছুড়ে মারলো জলন্ত বাড়ির মাঝে। ভাইয়ের কী সেই শেষ কান্নার রুল!
এরপর কিভাবে যে পাহাড়, সাগর আর কাঁটাতার পেরিয়ে এই কিশোরী কুতুপালং এসেছে- সেই দৃশ‌্যগুলো অশ্রুতে ধরেনা।
কিশোরীর আপন বলতে দুনিয়াতে এখন আর কেউ নেই। সত‌্যিই তার নামটি ধরে ডাকার মতো পৃথিবীতে আর কেউ নেই। তার নিজের নামটিও ভুলে যেতে বসেছে কিশোরীটি। খাওয়ার সময় হলে ডেকে খাওয়ানোর মতো আপনজনও পৃথিবীতে এখন আর কেউ নেই। তাই খাওয়াও ভুলে যেতে বসেছে সে। ভুলে যেতে বসেছে ক্ষুধা। হারিয়ে ফেলেছে ভাষা। ফুরিয়ে গেছে অশ্রু।
তবে আমার অশ্রু ফুরায়নি। আমি নিজের অশ্রুতে দেখে চলেছি ঘটনার ধারাবাহিক প্রতিচ্ছবি।
এক খালার সহযোগিতায় কুতুপালং পর্যন্ত পৌঁছেছে সে। এখানেও তার জন‌্য পাতানো আছে অনেক ফাঁদ। কেউ বাসার কাজের মেয়ে হিসেবে নিয়ে যেতে চায়। কেউ লোভ দেখায় শহরে ভালো চাকরির। কেউবা নিজের পরিবারের সদস‌্য হিসেবে নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু কাকে বিশ্বাস করবে এই কিশোরী।
কাজের মেয়ে হিসেবে গিয়ে যৌনদাসী হবে নাতো!
শহরে ভালো চাকরির নামে পতিতালয়ে ঠাঁই হবে নাতো!
পরিবারের সদস‌্য হিসেবে গিয়ে অন্ধকারে কোন জগতে চলে যাবে নাতো?
অবর্ণনীয় দৃশ‌্যের সাথে হাজারো প্রশ্নও ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়ে গড়িয়ে পড়ছে আমার অশ্রু বেয়ে।
বাবা-মাকে নাই বা পেলো; অন্তত নিজের দেশটি কি ফিরে পেতে পারেনা এই কিশোরী?

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *