jerseyspecialized স্বপ্ন- দেখার নাকি চাপিয়ে দেয়ার – MUAZZEM
Home / আত্মকথন / স্বপ্ন- দেখার নাকি চাপিয়ে দেয়ার

স্বপ্ন- দেখার নাকি চাপিয়ে দেয়ার

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ
স্বপ্ন। নিজেকে নিয়ে হোক আর অন‌্যকে নিয়ে হোক। সেটি স্বপ্ন।
কলেজ জীবনে একুশে টেলিভিশন টেনেছিল আমাকে। আকৃষ্ট করেছিল জ.ই মামুন আর মুন্নী শাহা’র রিপোর্ট।
সেটাই ছিল আমার স্বপ্ন। টিভি স্ক্রীন হয়ে উঠেছিল আমার শেখার টুলস। জ.ই মামুন আর মুন্নী শাহা ছিল আমার শিক্ষক।
মাঝে মাঝে সহপাঠীদের এই স্বপ্নের কথা জানাতাম। তারা খুব মজা নিতো। হাসি ঠাট্টা করতো। মাঝে মাঝে ইংরেজী বলতাম। এজন‌্য অপমানিতও হতে হয়েছিল। কিন্তু আমি স্বপ্নজয়ী। হয়তো এই স্বপ্ন দেখার কারণেই যুক্ত হতে পারি দেশের সবচেয়ে বড় ইংরেজী দৈনিক ডেইলী স্টারের সাথে। ডেইলী স্টারের আমার রিপোর্ট পুরুষ্কারও ছিনিয়ে আনে। ডেইলী স্টার থেকে একুশে টিভি হয়ে যুক্ত হই জ.ই মামুন আর মুন্নী শাহা’র একই পরিবারে। এক যুগের কাছাকাছি সময় ধরে এখনো আছি পরিবারটিতে। হ‌্যাঁ, এটিএন এ। আমার স্বপ্নের পরিবার। কলেজ জীবনে যারা মজা নিতো। তারা এখন মজা নেয় না। অনেকেই বরং সাপোর্ট নেয়।
আমার আশেপাশে ঘনিষ্টজনদের নিয়েও আমি অনেক স্বপ্ন দেখি। পড়ালেখা আর আইটি সেক্টর নিয়ে বেশি দেখি। আমার নিকটজনদের নিয়ে আইটি-স্বপ্নের বীজ বুনি। চারা গজায়। পরিচর্যা করি। একসময় আগাছা গজিয়ে সেগুলোকে ছেয়ে ফেলে। একটা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায় আইটিতে তাদের এগিয়ে চলা।
এতে আমার ভেতর দুই ধরণের কাজ করে। প্রথমটা- আমার একটি স্বপ্ন কেন আমি তাদের উপর চাপিয়ে দিলাম। এজন‌্য অপরাধবোধ কাজ করে। দ্বিতীয়টা- এতো সুন্দর গাইডলাইন এবং সাপোর্ট দেয়ার পরও তারা কেন একটা পর্যায়ে গিয়ে থেমে যায়। এজন‌্য।
নিজেকে খুব অপরাধী মনে হয়। ইচ্ছে করে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করতে। আমার আইটির স্বপ্নটা ঘনিষ্টজনদের উপর চাপিয়ে দেয়াটা অপরাধ। ইচ্ছা করলে আমার স্বপ্নটা আমি নিজেই পুরণ করতে পারি। অন‌্যদের উপর চাপিয়ে দেয়াটা আসলেই অযৌক্তিক। কেবল এই চিন্তা থেকেই আমি আইটিতে মনোযোগী হলাম। আইটি এখন আমার নিজেরও স্বপ্ন। সাংবাদিকতার কাজ শেষ করে আমার বন্ধুরা যখন ফেইসবুকে সময় কাটায়, আমি তখন অনলাইনে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগী হই। রাতে অন‌্যরা আড্ডায় মশগুল থাকলেও আমি কম্পিউটার নিয়ে বসে পড়ি। ফলশ্রুতিতে ২০১৩ সালের বেসিস আউটসোর্সিং এওয়ার্ড, ২০১৪ সালে জাতীয় মোবাইল এপস ডেভেলপমেন্ট প্রতিযোগিতায় জেলার প্রথম স্থান, ২০১৫ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ‌্যালয়ের বুথ ক‌্যাম্পে সাফল‌্য, ২০১৬ সালে সেরা ফ্রিল‌্যান্সার হিসেবে প্রিয় মন্ত্রী জুনায়েদ আহমেদ পলক ভাইয়ের হাত থেকে ল‌্যাপটপ গ্রহণ। আমি মনে করি, যাদের জন‌্য আমি আইটিতে স্বপ্ন দেখতাম তারাই এসবের অংশিদার। এসব তাদেরই প্রাপ‌্য ছিল। আমি বসে নেই। স্বপ্নচাষী আমি হালচষে যাই। এই বয়সে এসে নতুন করে পড়াশুনা শুরু করি। অনেক কোর্সে ভর্তি হই। ভার্সিটিতে কম্পিউটার সায়েন্সে ভর্তি হই। কোন শুভাকাঙ্খি কোথাও ভর্তি হওয়ার পরামর্শ দিলে ভর্তি হয়ে যাই। আমি এবং আমার স্ত্রী পাশাপাশি বসেও কোন কোন কোর্সে পাঠ গ্রহণ করি। এ নিয়ে অনেকেই হাসাহাসিও করে। এই হাসাহাসি আজকের না। অনেক আগেই আমি এসবের মোকাবেলা করতে শিখেছি। অনেকেই বলে, “ভালো জায়গায় আছো। ভালো কাজ করছো। নতুন করে আরো পড়ালেখা করে কি করবে?”
যারা স্বপ্ন দেখে, তারাই কেবল এটা বুঝবে।
আর যাদের নিয়ে স্বপ্ন দেখতাম, সবাই যে হতাশ করেছে তা নয়। একজন আমাকে বেশ পুলকিতও করেছে। আমাকে স্বপ্নের বাগানে ফুল ফুটিয়ে দেখিয়েছে। ফল দিয়েছে। Tahania Nasrin Ripa। আমার স্ত্রী। সে এসএসসি পাশ করার পর তার সাথে আমার বিয়ে হয়। আমাদের সমাজ ব‌্যবস্থাই এমন যে বিয়ের পরদিন থেকেই মেয়েদের পড়ালেখা বন্ধ। অনেকেই ব‌্যতিক্রমও আছে। তাদের প্রতি শ্রদ্ধা। আমাকে ওর পড়ালেখা নিয়মিত করতে অনেক প্রতিকূল পরিবেশ মোকাবেলা করতে হয়েছে। একসময় সে নিজেও হাল ছেড়ে দেয়। আমি হাল ছাড়ার মানুষ নয়। ঘনিষ্টদের অনেকের সাথে সাময়িক সম্পর্কেও টানাপোড়েন হয়। পরে ঠিক হয়ে যায়। অথচ এই মেয়েটি জীবনে একবারও ফেল করেনি। অনেক সম্ভাবনাময়ী। এরকম একটি সম্ভাবনার আতুঁড়ঘরে মৃত‌্যু কিভাবে হতে দিই!
গতকাল যখন অনার্সে তার সেরা রেজাল্টটি আমাকে দেখালো। আনন্দে আমার চোখে অশ্রু চলে এসেছিল। তার চোখের কোনেও মুক্তোকণার মতো বিন্দু বিন্দু অশ্রু গড়িয়ে যেতে দেখলাম। অনেকের কাছেই এটি খুবই সাধারণ কিছু। কোন সাফল‌্যই নয়। অনার্স তো হাজার হাজার মেয়েই পাশ করে। কিন্তু হাজারো প্রতিকূলতা পেরিয়ে যারা এই সাফল‌্যের মুখ দেখে, তাদের কাছে এটি যুদ্ধজয়ের আনন্দ।
আজ তার অনলাইনে ব‌্যস্ততা বেশি। নানা বিষয়ে সার্চ করে পড়াশুনা করছে। মাস্টার্সে কোথায় ভর্তি হবে। মাস্টার্সটা কতদিনে শেষ হবে। কিভাবে বিসিএসটা দেয়া যায়। কিভাবে পিএইচডিটা করা যায়। এসব নানা বিষয়ে সে আজ আমার সাথেও আলোচনা করছে। তাকে নিয়ে দেখা আমার স্বপ্নগুলো নিয়ে সে নাড়াচাড়া করছে। বিষয়টি আমাকে বেশ আবেগপ্রবণ করে তুলেছে। একটা মেয়েকে কতকিছু সামলাতে হয়! স্বামী, শ্বাশুরবাড়ী, বাবারবাড়ী, সন্তান। এতোকিছু সামলিয়ে তুমি স্বপ্ন দেখার পুসরত পাও!
স্বপ্ন দেখতে শেখো। স্বপ্নবুনে চলো। তোমার জন‌্য অনেক ভালোবাসা ও শুভকামনা।
আর যারা গুহার জগত থেকে বেরিয়ে আসতে চাও। এসো। পড়ি।

Check Also

বনসাই

মোয়াজ্জেম হোসাইন সাকিল ঃ ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট। পুরো পৃথিবীই স্বাভাবিক নিয়মে চলছে। জাপানের মানুষগুলো কেবল …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *